Pages - Menu

Pages - Menu

Saturday, 30 August 2014

দ্য ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন বাংলাদেশ-

হ্যালো বাংলাদেশ! ‘ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন’ ক্যাম্পেইন নিয়ে আমি আবার বাংলাদেশে পা রেখেছি। এবার আমাদের লক্ষ্য এক মাসে সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় এর প্রচারণা চালানো। নিজের কাজ নিয়ে পূ্র্বপুরুষের দেশে আবার ফিরে আসতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লাগছে।
দ্য ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন বাংলাদেশ-এর মিশন ২৬ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে রোটারি ক্লাব অব ঢাকা রেডিয়ান্টের সহযোগিতায়। ঢাকায় আমাদের লক্ষ্য অন্তত ২০টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। ঢাকা ছাড়াও আমরা আমাদের প্রচারণা অনুষ্ঠানকে ছড়িয়ে দিতে চাই খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, রাজশাহী, বগুড়া, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ সারা দেশে। এবারের ‘ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন’ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, এই অভিযানটি এক মিলিয়ন অর্থাৎ ১০ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করার গৌরবময় মাইলফলক ছুঁতে যাচ্ছে ১৮ সেপ্টেম্বর আয়োজিত অনুষ্ঠানে।
সব অনুষ্ঠানের খবরই আমার ফেসবুক পেজে পাওয়া যাবে: www.fb.com/sabirulislam123
সাবিরুল ইসলামইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়নের প্রচারণা চালাতে গিয়ে আমি গুরুত্বপূর্ণ দুটি জিনিস শিখেছি। প্রথমটি হলো, নিজের স্বপ্নকে বড় করা। যত পাগলাটে কিংবা আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভবই মনে হোক না কেন, আমাদের স্বপ্নগুলো বড় হওয়া চাই। আমার বয়স তখন ছিল মাত্র ১৯, যখন নাইজেরিয়া ভ্রমণে গিয়ে ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়নের চিন্তাটি আমার মাথায় আসে। অনেক পরিকল্পনা, আত্মনিবেদন ও নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে উপলব্ধির পরে আমি শিখলাম, নিজের উপস্থিতি দিয়ে কীভাবে হাজারো মানুষকে অনুপ্রাণিত করা যায়। আর এটিই বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষকে আমার স্বপ্নে উজ্জীবিত করেছে, তাদের অনুপ্রাণিত করেছে দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে। এই মানুষগুলোই আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মতো দরকারি কাজ কোনোটি নেই। এই মহৎ প্রাণগুলোই ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন ক্যাম্পেইনকে সফল করে তুলেছে।
দ্বিতীয়টি, ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়নের মাধ্যমেই আমি নিজের প্রশংসা করতে শিখেছি এবং নিজের সত্তাকে বুঝতে পেরেছি। কীভাবে? আমি সব সময়ই মনে করেছি, আমার জীবনটা অনেক কঠিন ছিল। আমার জীবন ছিল যুক্তরাজ্যের অন্যতম অনগ্রসর একটি সমাজে বড় হয়ে ওঠার কষ্টকর জীবন। কিন্তু, এখন আমি বিশ্বের ২৬টিরও অধিক দেশে গিয়েছি এবং গত তিন বছরে ৭০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছি। বিশ্বের নানা প্রান্তে বিচিত্র কর্মজগতের মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তাদের কেউ কেউ নিজেদের জীবনে অনেক সফল, কারও মত আমার মতের সঙ্গে বেশ মিলে যায়, আবার তাদের অনেকে এমন পরিবেশে বড় হয়েছে, যেটা আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশের চেয়েও অনেকগুণ প্রতিকূল। এই বিচিত্র সব পরিচিতি আমার চোখ খুলে দিয়েছে এবং শিখিয়েছে নিজের জীবনের কীভাবে প্রশংসা করতে হয়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে একটা ভ্রমণ হিসেবে উপভোগ করা উচিত, তাহলে সে জীবনের গল্প সবাইকে অনুপ্রাণিত করবে।
যখন আমরা জীবনে কোনো কিছু করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তখন শুধু অন্তিম ফলটাই মুখ্য নয়। কারণ, পাহাড়ে আরোহণের সময় চূড়ায় ওঠাটা মূল গল্প নয়। শীর্ষে একজন কী করল তা কাউকে অনুপ্রাণিত করে না, কিন্তু চূড়ায় ওঠার যে কষ্টকর যাত্রা, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে প্রাণান্তকর যে লড়াই করে চূড়ায় ওঠার সাধনা—সে গল্পটাই সবাই আগ্রহ নিয়ে শুনতে চায়। এ কারণে জীবনে যাত্রাপথটাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দাও এবং এর প্রশংসা করো।
পাঠকদের অনেককেই মূল আয়োজনে দেখার আশা রাখি। ভালোবাসি প্রিয় বাংলাদেশকে।

আমরা খাবারের অভাবে বরফের টুকরো চুষে খেয়েছি ?

ছোটবেলাটা বলতে গেলে নিউইয়র্কের পথেই কাটিয়েছেন লিজ মারি। সরকারি সামান্য ভাতার টাকা বাবা-মা কোকেন আর হেরোইন সেবন করে উড়িয়ে দিতেন; লিজ ও তার বোনকে ক্ষুধার্ত রেখেই। শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিজ বলেন, ‘এমন দিন গেছে, যখন আমরা খাবারের অভাবে বরফের টুকরো চুষে খেয়েছি, যেন মনে করতে পারি কিছু তো খাচ্ছি। ক্ষুধায় দুবোন ভাগাভাগি করে টুথপেস্টও খেয়েছি।’ প্রতিবেশীদের কাছে খাবার ভিক্ষা করে বেড়াতেন তিনি, মাঝেমধ্যে খাবার চুরি করেও খেতেন। এখন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সর্বাধিক বিক্রীত বইয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে তাঁর লেখা বই মাই জার্নি ফ্রম হোমলেস টু হার্ভার্ড।
মাদকাসক্তি আর তীব্র দারিদ্র্য লিজের বাবা-মাকে সম্পূর্ণ অসহায় করে ফেলেছিল, সন্তানদের প্রতি কোনো দায়িত্ব তাঁরা পালন করতে পারেননি। মেয়ের জন্মদিনের উপহার, ঘরের টেলিভিশন, এমনকি উৎসবের দিনে গির্জা থেকে পাওয়া টার্কিটিও তার মা বিক্রি করে দিয়েছিলেন; কোকেন কিনতে হবে যে! লিজের মাথাভর্তি ছিল উকুন, সহপাঠীরা বলত, তার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এভাবে বেশি দিন স্কুলে টিকতে না পেরে ছোট্ট লিজ স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
লিজের মা বলতেন, ‘একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে,’ বলতে বলতেই বমি করে ফেলতেন কিংবা সারা দিন মৃতপ্রায় হয়ে বিছানায় পড়ে থাকতেন, তত দিনে তার সারা বাহুতে সুচের দাগ। লিজের বয়স যখন ১৫, তখন তার মায়ের এইডস রোগ ধরা পড়ে। এরপর তিনি আর বেশি দিন বাঁচেননি। তাঁর মৃতদেহ রাখার কফিনটিও ছিল কোনো একজনের দান করা।
মায়ের মৃত্যুর পর লিজের ঠাঁই হয় শহরের পার্কের বেঞ্চগুলোয় আর দিন-রাত চালু থাকা রেলস্টেশনে। তিনি বলেন, ‘মায়ের মতো আমিও ভাবতাম, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই যখন চোখের সামনে মাকে মারা যেতে দেখলাম, তখন বুঝলাম আমাকে এই মুহূর্ত থেকেই সব ঠিক করতে হবে, নয়তো কোনো দিনই কিছু ঠিক হবে না।’
বহুদিন স্কুলের পড়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তাও হাল ছাড়লেন না লিজ। একের পর এক স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন, কিন্তু কেউই তাকে নিতে রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে বহু কষ্টে ম্যানহাটনের হিউম্যানিটিস প্রিপারেটরি একাডেমিতে ভর্তি হলেন। শুরু হল এক নতুন সংগ্রাম। এক বছরে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যতটা শেখে, তা এক টার্মের মধ্যেই শেষ করতে লাগলেন তিনি। এক শিক্ষকের চোখে পড়ল লিজের এই প্রাণান্তকর চেষ্টা আর অধ্যবসায়। তার সহায়তায় ও নির্দেশনায় দুই বছরের মাথায় কলেজের পড়া শেষ করে ফেললেন। সেই শিক্ষক একদিন লিজসহ তার সেরা ১০ শিক্ষার্থীকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে গেলেন। এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে লিজের মতো মেয়ের ভয়ে বুক শুকিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু কেন যেন তার হার্ভার্ডের পরিবেশ দারুণ ভালো লেগে গেল, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলেন এর স্থাপত্যশৈলীর দিকে। মনে মনে ঠিক করলেন, এখানেই পড়তে হবে, চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই সম্ভব। কিছুদিন পরেই জানতে পারলেন, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা হার্ভার্ডে পড়ার জন্য বৃত্তি দেয়। ব্যস, পড়াশোনার জন্য তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
লিজের বাবা ২০০৬ সালে এইডসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নিজে মাদকাসক্ত হলেও তিনি লাইব্রেরি থেকে বই চুরি করে মেয়েকে এনে দিতেন। বাবা হিসেবে মেয়েকে কিছু দিতে না পারলেও মেয়ের মনে তিনি পড়াশোনার প্রতি, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন, এটিই ছিল তাঁর একমাত্র সান্ত্বনা। অবশেষে ২০০৯ সালের জুনে হার্ভার্ড থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন লিজ। পরে আবার একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার জন্য। হার্ভার্ডে থাকার সময় তিনি বিভিন্ন স্থানে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন, যেসব তরুণ-তরুণী তাঁর মতো সংগ্রাম করে টিকে আছেন, তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তিনি। অতঃপর তিনি ‘ম্যানিফেস্ট লিভিং’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা এমন মানুষের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে সাহায্য করে। তিনি এখন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বক্তা ও লেখক। তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র—হোমলেস টু হার্ভার্ড: দ্য লিজ মারি স্টোরি। অপরাহ উইনফ্রের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে দেখা করেছেন, এমনকি টনি ব্লেয়ার, মিখাইল গর্বাচেভ ও দালাই লামার মতো বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে বক্তৃতাও করেছেন। লিজ কিশোর-কিশোরীদের মাদক ও অপরাধের চক্রে জড়িয়ে না পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। জানান, শৈশবের দুঃখ-কষ্ট-সংগ্রামের পরও চেষ্টা থাকলে ও সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে জীবনে সফল হওয়া যায়। এর বাস্তব উদাহরণ তিনি নিজে। একদিন রাস্তায় ছোট্ট লিজকে দেখে লোকজন মুখ ফিরিয়ে নিত, আর আজ তার স্থান অসংখ্য তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে, যারা নিজের চেষ্টায় জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান www.theguardian.com এর নিবন্ধ অবলম্বনে

Monday, 25 August 2014

যারা যতো বেশি ব্যায়াম করেছেন

হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন তারা। এমন ২ হাজার ৪০০ জনের ওপর গবেষণা চালানো হলো। প্রাথমিকভাবে গবেষকরা দেখলেন, যারা যতো বেশি ব্যায়াম করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে হার্টের মারাত্মক অসুখে আক্রান্ত হয়েও মৃত্যুর ঝুঁকি ততোটাই কম। কিন্তু, অবশ্যই সেখানে একটা সীমারেখা রয়েছে। অনেকেই মনে করে থাকেন, ব্যায়াম বেশি করলে ক্ষতিটা কোথায়! এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সবকিছুর মধ্যেই পরিমিতি বোধটা থাকা খুব জরুরি। ওই গবেষণার গবেষকরা জানালেন, প্রতি সপ্তাহে যারা ৩০ মাইলের বেশি দৌড়াতেন, তাদের ক্ষেত্রে শরীরচর্চার সুফল বা উপকারের মাত্রাটা কমতে লাগলো। অন্যদিকে, যারা সপ্তাহে ৪৬ মাইল অর্থাৎ দিনে সাড়ে ৬ মাইলের বেশি হাঁটতেন, তারাও ব্যায়ামের উপকার থেকে বঞ্চিত হলেন। ‘মায়ো ক্লিনিক প্রসিডিংস’ সাময়িকীতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। গবেষণা এখানেই শেষ নয়। দেখা গেলো, যারা সপ্তাহে অতিরিক্ত ব্যায়াম করছেন, তাদের ক্ষেত্রে হার্টের অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন লরেন্স বার্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পল উইলিয়ামস ও হার্টফোর্ড হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের পল থম্পসন। অতিরিক্ত ব্যায়াম নয়। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক গঠনভেদে ব্যায়ামের মাত্রাটা নির্ধারণ করে নেয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টা মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করা যেতে পারে। আর ভারি ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সপ্তাহে অবশ্যই ৭৫ মিনিটের বেশি নয়। তবে বয়সের তারতম্য ও শারীরিক গঠনভেদে ব্যায়ামের তারতম্য হতে পারে। হার্টের অসুখে যারা ভুগছেন, তাদের অবশ্যই ব্যায়ামটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। যে কোন বয়সেই প্রতিদিন ব্যায়াম নয়। সপ্তাহে ৪-৫ দিন ব্যায়াম এবং বাকি দিনগুলো পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। এতে ব্যায়ামের উপকারটাও পাওয়া যাবে। সাধারণভাবে, অধিকাংশ হার্টের রোগীদের বেশির ভাগ দিন ৩০-৪০ মিনিট ব্যায়াম করা উচিত। এর বেশি ব্যায়ামের তেমন যৌক্তিকতাও খুঁজে পাননি গবেষকরা। তারা বলছেন, ব্যায়াম ৬০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার বেশি করা

দেশের সবচেয়ে ভালো মেধাবীদের ৮০ ভাগ বিদেশে চলে যায়

যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির আদলে বাংলাদেশের তরুণেরা তৈরি করবেন ‘সিলিকন বাংলাদেশ’। তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে সরকারি-বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ২৩ আগস্ট শনিবার বিকেলে দৈনিক ইত্তেফাক ও স্টার্ট আপ ঢাকা আয়োজিত ‘সিলিকন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা ‘সিলিকন বাংলাদেশ’ তৈরির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি শামীম আহসান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুগল ইউএসএ এজেন্সি ডেভেলপমেন্ট প্রধান বিকি রাসেল। মূল প্রবন্ধ প্রদর্শন করেন বিগ ডাটা পার্টনারশিপ ইউকের প্রিন্সিপাল কনসালট্যান্ট ক্রিশ্চিয়ান প্রকপ।

দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক তারিন হোসেইনের সঞ্চালনায় বৈঠকে আরও আলোচনা করেন বিসিএস সভাপতি মাহফুজুল আরিফ, বিসিসির নির্বাহী পরিচালক আশরাফুল ইসলাম, ওকে মোবাইলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান, স্টার্ট আপ ঢাকার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাইয়াজ তাহের, ইল্যান্স-ওডেস্কের বাংলাদেশ কান্ট্রি ম্যানেজার সাইদুর মামুন খান, টিম ইঞ্জিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামিরা জুবেরী হিমিকা, এটুআইয়ের যোগাযোগ কর্মকর্তা হাসান বেনাউল ইসলাম প্রমুখ।

প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। প্রতি মাসে ৪০ হাজার সাধারণ জনগণ ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে সেবা নিচ্ছে। সরকারি ২৫ হাজার ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, গুগলের সহায়তায় ৪০০টি স্কুলে চার লাখ শিক্ষার্থীকে ইন্টারনেট-সম্পর্কিত জ্ঞানদানের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে যাতে ফেসবুক, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। ৫৫ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরির কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি হতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। সবাই মিলে কাজ করলে একদিন সিলিকন বাংলাদেশ তৈরি হবে।

বেসিস সভাপতি শামীম আহসান বলেন, ‘দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক/এনবিএফআই কিংবা তাদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানিকে দুইবার ট্যাক্স দিতে হয়। এ বিষয়ে একটি সমাধান প্রয়োজন। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য আমাদের দেশে কোনো আইন নেই। উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ভেঞ্চারের গুরুত্ব বিবেচনায় এ-সংক্রান্ত আইন করা প্রয়োজন। দেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল যদি সফল হতে পারে, তবে অনেকেই এদিকে এগিয়ে আসবে। ফলে এর মাধ্যমেও ব্যবসায়ের অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহজতর হবে। পাশাপাশি শুধু বিনিয়োগ পাওয়া নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে যেতে হবে।’

শামীম আহসান আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে ভালো মেধাবীদের ৮০ ভাগ বিদেশে চলে যায়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মেধা ও পুঁজি দেশে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সংযোগ স্থাপন করে প্রযুক্তি খাতের দেশি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন কিংবা বিদ্যমান শিল্পে তাদের মেধা প্রয়োগের ব্যবস্থা করা জরুরি। এ জন্য সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।

গুগল ইউএসএ এজেন্সি ডেভেলপমেন্ট প্রধান রাসেল বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও সিলিকন বাংলাদেশ তৈরি করতে সর্বস্তর থেকে উদ্ভাবনী আইডিয়া তুলে আনতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি তাঁদের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে উত্সাহিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিনির্ধারণ করতে হবে।

বৈঠকে বক্তারা বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি স্টার্ট আপ কোম্পানি কিনতে চায়। তবে তাঁদের আগে দেখাতে হবে আমার সেই স্টার্ট আপের পেছনে কতটা বিনিয়োগ করেছি। এ ছাড়া সিলিকন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাইলে সবাইকে হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে।

পরীক্ষার নম্বরগুলো তোমাকে কিছু বিষয় জানাবে

সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ব্যারোফোর্ড প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন। তাঁর সেই চিঠি বিবিসি প্রকাশ করার পর থেকে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। চিঠিতে প্রধান শিক্ষক কেবল লিখিত পরীক্ষাই যে জীবনের সব নয়, সে কথাটি তাঁর শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। সেই চিঠিতে তিনি যা লিখেছেন, তার ভাবার্থ হলো—
প্রিয় চার্লি ওয়েন,
‘আনন্দের সঙ্গে আমি তোমার পরীক্ষার ফলাফল এর সঙ্গে পাঠাচ্ছি। তোমাকে নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত, কারণ এই কৌশলী সপ্তাহে তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে অনেক পরিশ্রম করেছ।
‘কিন্তু আমরা এও জানি, এই পরীক্ষাগুলো তোমাদের বিশেষত্ব বা এককত্বকে কখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এগুলো যারা তৈরি করেছে এবং মূল্যায়ন করে তোমাকে নম্বর দিয়েছে, তারা তোমাদের প্রত্যেককে চেনে না, যেমনটি তোমাদের শিক্ষকেরা চেনেন বা তোমাদের পরিবার জানে। তারা জানে না যে তোমাদের মধ্যে অনেকেই দুটো ভাষা জানো। তুমি যে একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারো, পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাও কিংবা চমৎকার ছবি আঁকতে পারো, তার খবর তারা রাখেই না। তারা তো জানে না, তোমার হাসি কেমন করে একটি দিনকে রাঙিয়ে তুলতে পারে, খেলার মাঠে তোমার বন্ধুরা তোমার জন্য কেন অপেক্ষার প্রহর গোনে। তোমার কবিতা, গান লেখার খবর যেমন তারা রাখে না, তেমনি স্কুল ছুটির পর তুমি যে তোমার ছোট ভাই বা বোনকে পরম মমতায় আগলে রাখো, সেটাও কিন্তু তারা জানে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার ভাবনা, পৃথিবীর সুন্দর সুন্দর দেশ ঘুরে বেড়ানোর তোমার অভিজ্ঞতা—এগুলোও কী তারা জানে? জানে না। তুমি যে চমৎকার গল্প করতে পারো, নিকটজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসো—এগুলোর খবরও তারা পরোয়া করে না। কাজে তারা জানে না যে তুমি একজন বিশ্বস্ত, চিন্তাশীল এবং প্রতিদিনই তুমি ক্রমাগত ভালো করার চেষ্টা করছ। পরীক্ষার নম্বরগুলো তোমাকে কিছু বিষয় জানাবে বটে, তবে তা কখনো সবকিছু নয়।
‘কাজেই তোমার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে গর্ব করো, সেটিকে উপভোগ করো। কিন্তু মনে রাখবে, জীবনে চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে।’
চিঠিটি আমি যতবারই পড়ি, আমার চোখের সামনে আমার বন্ধুর মুখ ভেসে ওঠে। তার মেয়েটি এবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। প্রতিটি পরীক্ষার শেষে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, স্কুল তাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে যদি না সে পরীক্ষায় আরও ভালো করে। মেয়েটি ভালো ছবি আঁকে, কয়েকটি বিষয়ে ভালোও করে। কিন্তু তার মুখস্থের ক্ষমতা কম। ফলে সে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পায় না। স্কুল তাকে নিয়ে চিন্তিত, কারণ তার জন্য জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্কুলের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্কুলের র্যাঙ্কিং নিচে নেমে যাবে!
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে আমার নিয়ত দেখা হয়। তাঁরা ঠিক বুঝতে পারেন না, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েকে এত তাড়াতাড়ি দু-দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হবে, যেখানে কিনা কেবল কিছু প্রশ্নের লিখিত উত্তর দিতে হয়! শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবলই লিখতে পারা? আর সবারই বা কেন জিপিএ-৫ পেতে হবে?
অভিভাবকদের কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। কারণ, মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার সব উদ্দেশ্য পাসের মধ্যে গিয়ে ঠেকেছে। অনেক ভালো উদ্যোগও কিন্তু ওই পাস-ফেলের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতনতার কথাই ধরা যাক। এখন আলাদা করে প্রতিটি ক্লাসে এই বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যখনই কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন, দেখবেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ভালো করে হাত না ধুয়েই খাবার টেবিলে বসে পড়ছে। খাওয়া শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুতে সবারই কিন্তু আগ্রহ আছে! তাদের অনেকেই কিন্তু জানে, ‘খাওয়ার আগে ভালোমতো হাত পরিষ্কার করতে হয়’। শুধু যে জানে তা নয়, বরং খবর নিলে দেখা যাবে, সেগুলো পরীক্ষার খাতায় লিখে রীতিমতো শতভাগ নম্বর পাচ্ছে। কিন্তু ওই নম্বর দিয়ে ওর কী লাভ হচ্ছে? ও কি আদতেই স্বাস্থ্যসচেতন হতে পারছে?
১১ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘শিক্ষার্থীরা পড়ছে না কেন?’ শিরোনামের আমার একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। সেটি পড়ে একজন আমাকে লিখেছেন, ‘আপনার এই লেখাটি পড়ে আমি অনেক কষ্ট পাচ্ছি এই সময়ের স্টুডেন্টদের জন্য। আমার ছোট ভাইও এবার পিএসসি পরীক্ষা দেবে, অথচ তার পাঠ্যবই পড়ার কোনো রকম আগ্রহ নেই, গল্পের বই পড়ার তো প্রশ্নই আসে না। আগে আমি যখন বছরের শুরুতে নতুন বই হাতে পেতাম, অনেক আগ্রহের সঙ্গে নতুন বইগুলো পড়তাম, কিন্তু আমার ভাই কারণ ছাড়া বইগুলো হাতেও নেয় না। ওর স্কুল থেকে বলে দিয়েছে, ওই গাইডটা কিনতে। এরপর ওই গাইড কিনে এনে সে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো মুখস্থ করছে। এভাবে পড়ে যদি সে এ-প্লাসও পায়, তাহলেই বা কী?’
শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা নয়; বরং শিক্ষা তখনই সফল হয়, যখন কিনা একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, জানা বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে পারে, আশপাশের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, সতীর্থদের সঙ্গে যেমন আনন্দের সঙ্গে কাটাতে পারে, তেমনি বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করতে শেখে। কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে আর যাই হোক, শিক্ষার্থীর নানান দিক কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় না। আধুনিক শিশুশিক্ষার অন্যতম সূচনাকারী মন্টেসরি তো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার চেয়ে সার্বক্ষণিক মূল্যায়নে জোর দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা কি পরস্পরকে সহযোগিতা করছে, ক্লাসের শৃঙ্খলা মেনে চলছে—এসবও কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠার ব্যাপারটা প্রভাবিত করে। আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় এসব মূল্যায়নের সুযোগ কই? কেবল মুখস্থ ক্ষমতার দৌড় দেখা ছাড়া?
আমাদের শিক্ষাকর্তাদের কাছে আমার আবেদন থাকবে, অনুগ্রহ করে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রভাব এবং এগুলো আদৌ কোনো উপকার করছে কি না, তা ঠিকমতো জেনে এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিন। আমাদের ছেলেমেয়েরা জানুক, চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে এবং তাদের শৈশব আনন্দময় হোক।
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

বিল্লি নে কাট দিয়া

বিল্লি নে কাট দিয়া’। হুমায়ূন আহমেদের পাঠকেরা এই সংলাপটির সঙ্গে নিশ্চয়ই পরিচিত। অবশ্য শুধু ভারতীয় সংস্কৃতিতে নয়, কালো বিড়ালকে অপয়া ভাবা হয় বিশ্বের অনেক দেশেই। কালো বিড়ালের সঙ্গে ডাকিনিবিদ্যা আর তন্ত্রমন্ত্রের যোগসূত্র দেখিয়ে কম কল্পগল্পও হয়নি। সেই কালো বিড়াল কাল বার্সেলোনার মাঠে! সেটিও বার্সার মৌসুম শুরুর প্রথম ম্যাচের একেবারে প্রথম মিনিটে!
রেফারির খেলা শুরুর বাঁশি বাজার কয়েক সেকেন্ড পরেই খেলা থামিয়ে দিতে হয়। বার্সার নতুন গোলরক্ষক ক্লদিও ব্রাভোর রাজ্যসীমা ডি-বক্সের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে কালো বিড়াল! মিশমিশে কালো। হাভিয়ের মাচেরানো এসে তাড়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু বিড়াল বাবাজি বোধ হয় বিশ্বের কোটি চোখের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে বেশ মজাই পাচ্ছিল। কিছুতেই মাঠ ছেড়ে বেরোবে না পণ করেছিল। শেষে মাঠকর্মীদের একজন খপাত্ করে ধরে মাঠের বাইরে নিয়ে যায় বিড়ালটাকে। গায়ে মোচড়-টোচড় দিয়ে বিড়ালটি প্রতিবাদও জানাচ্ছিল। হাতের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে পেতে এক্কেবারে মাঠের বাইরে।
স্পেনেও কালো বিড়াল অপয়া হিসেবেই দেখা হয়। এবং কী অবাক করা ব্যাপার, মৌসুমের প্রথম গোলটা পেতে হন্যে হয়ে থাকা বার্সাকে দুই দুবার আটকাল গোলপোস্ট। প্রথমে বার্সার নতুন বিস্ময়-বালক মুনির এল হেদাদির, এরপর ইনিয়েস্তার শট লেগে ফিরল।
লিওনেল মেসি দুর্দান্ত গোল করে সেই অপয়া ভূতটা তাড়িয়েছেন কি তাড়াননি, এমন সময় প্রথমার্ধেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলা মাচেরানো। এই মাচেরানোই কিন্তু বিড়ালটিকে প্রথম তাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন! তবে কি বিড়ালেরই অভিশাপ?
বিজ্ঞানমনস্ক মনও কিন্তু প্রিয়জনের বিপদে সংস্কারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বার্সা কিছুতেই গোলের দেখা পাচ্ছিল না যখন, সমর্থকদের মনে কালো বিড়ালের ছায়া উঁকি না দিয়ে যায়নি। অবশ্য সমর্থকেরা প্রত্যাশা করবে, অভিশাপটা মাচেরানোর এক লাল কার্ডের ওপর দিয়ে চলে গেলেই ভালো। প্রথম ম্যাচটা বার্সা যেমন ১০ জনের দল নিয়েও ৩-০ গোলের দাপুটে জয় দিয়ে শুরু করেছে, সেই ধারা যেন বজায় থাকে পুরো মৌসুমে।
ভয়ের কথা হলো, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ন্যু ক্যাম্পেও একটি কালো বিড়াল ঢুকে পড়েছিল। সেদিন রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে ম্যাচটা জিতলেও ২০১১-১২ মৌসুমে কিন্তু লিগ শিরোপা জেতা হয়নি বার্সার!

দি আনফিনিশড রেভল্যুশন

লরেন্স লিফশুলজের গ্রন্থ বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভল্যুশন (জেড প্রেস, লন্ডন, ১৯৭৯) থেকে আমি অনেক তথ্যের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। আবু তাহেরের জবানবন্দিটি এই গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। এই জবানবন্দির কোথাও বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির পিতা (ফাদার অব দ্য নেশন) শব্দাবলির উল্লেখ নেই।
আমি আবু তাহেরের জীবনী লিখতে বসিনি। আমার বিষয় ‘জাসদ’। তাহেরের প্রসঙ্গ এসেছে। কেননা, তিনি জাসদের সামরিক সংগঠন গণবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন।
তবে এটাও সত্য যে দিন–রাত বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির পিতা জপ করলেই শেখ মুজিবের প্রতি সম্মান দেখানো হয় না। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি, গ্রামের সাধারণ মানুষ চার অক্ষরের ছোট্ট একটা শব্দে তাঁর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করত। হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে আসা শব্দটি ছিল ‘মজিবর’। যাঁরা এখন ২৪ ঘণ্টা বঙ্গবন্ধু আর জাতির পিতা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, তাঁদের ভাবসাব দেখলে মনে হয় তাঁরাই আওয়ামী লীগ তৈরি করেছেন, আর শেখ হাসিনা পরে তাঁদের দলে যোগ দিয়েছেন।
তাহের সম্পর্কে যে উদ্ধৃতি নিয়ে এত হইচই হচ্ছে, তারও একটা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। আমরা এটাকে ‘লুজ টক’ বা কথার কথা বলে এড়িয়ে যেতে চাইলেও শেখ মুজিবের প্রতি তাহেরের প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। শেখ মুজিব যেখানে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগের পর তাঁকে একটি চাকরি দিয়েছিলেন, তিনি সেই চাকরির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গণবাহিনী বানিয়েছিলেন মুজিব সরকারকে উৎখাত করার জন্যই। এ ছাড়া গণবাহিনীর আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভূমিকা সবার জানা, কীভাবে একটার পর একটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছিল, কীভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছিল। আমাদের সমস্ত লালিত আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও মূল্যবোধ একের পর এক ধ্বংস করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে কবর দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত নোংরাভাবে। জনগণকে পদদলিত করে জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র।’ এই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল ১৫ আগস্ট সকালে। তাই তাহের খুনি মেজরদের ‘অনুরোধে’ সকালেই ছুটে গেছেন ঢাকা বেতারকেন্দ্রে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বৈধ রাষ্ট্রপতির রক্তাক্ত মৃতদেহ সাড়ে ৩৩ ঘণ্টা অনাদরে, অবহেলায় পড়ে ছিল। একজন পাকিস্তান-প্রত্যাগত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে নিজের প্রাণটি বিসর্জন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে বেসামরিক কর্মকর্তা কর্নেল তাহের বীর উত্তম একজন অবৈধ রাষ্ট্রপতিকে সামরিক আইন জারি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কী নিদারুণ বৈপরীত্য!
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অনেকে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে এবং আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে একটা সমীকরণ তৈরি হবে। রাজনীতিতে এ ধরনের সমীকরণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে জোর করে আবু তাহেরকে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ বানানোর তো প্রয়োজন নেই। এই কাজটি করে যাঁরা নানা ধরনের ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন, তাঁদের লোভের আগুনে তাহেরের লাশ আবারও পুড়ছে।
অধ্যাপক হোসেন তাহের প্রসঙ্গে আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। আদালতের এই রায়ই শেষ কথা নয়। উচিত হবে একটি ‘কমিশন’ গঠন করা, যাতে করে ১৫ আগস্টের ঘটনার পূর্বাপর এবং এর নেপথ্যের কুশীলবদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়।
আমার লেখার ভগ্নাংশ ছাপা হয়েছে। পুরো বইতে তাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। পাঠক আরও অনেক কিছু জানতে পারবেন, ভাবনাচিন্তার খোরাক পাবেন, যখন বইটি আলোর মুখ দেখবে। তখন সুযোগ তৈরি হবে ফিরে দেখার, অ্যাকাডেমিক আলোচনার। এর আগেই যদি আমরা সত্য লুকাতে চাই এবং নির্মম সত্যকথনের জন্য লেখককে ব্র্যান্ডিং করতে চাই, সেটা কোনো উদারতার পরিচায়ক হবে না। আমাদের উচিত হবে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বাদ দিয়ে সত্যের মুখোমুখি হওয়া। একদা খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমকে যাঁরা ‘ভারতের দালাল’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ব্র্যান্ডিং করে জেনারেল জিয়াকে সামনে রেখে বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন, তার পরিণতিতে খালেদ নিহত হয়েছিলেন আরও দুজন বীর উত্তম হুদা, হায়দারসহ। ক্ষমতার লড়াইয়ের এই বিপজ্জনক খেলায় তাহের নিজেও শিকার হয়েছিলেন। আমরা কি এখান থেকেও কোনো শিক্ষা নেব না?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com