Pages - Menu

Pages - Menu

Monday, 25 August 2014

দি আনফিনিশড রেভল্যুশন

লরেন্স লিফশুলজের গ্রন্থ বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভল্যুশন (জেড প্রেস, লন্ডন, ১৯৭৯) থেকে আমি অনেক তথ্যের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। আবু তাহেরের জবানবন্দিটি এই গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে। এই জবানবন্দির কোথাও বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির পিতা (ফাদার অব দ্য নেশন) শব্দাবলির উল্লেখ নেই।
আমি আবু তাহেরের জীবনী লিখতে বসিনি। আমার বিষয় ‘জাসদ’। তাহেরের প্রসঙ্গ এসেছে। কেননা, তিনি জাসদের সামরিক সংগঠন গণবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন।
তবে এটাও সত্য যে দিন–রাত বঙ্গবন্ধু কিংবা জাতির পিতা জপ করলেই শেখ মুজিবের প্রতি সম্মান দেখানো হয় না। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছি, গ্রামের সাধারণ মানুষ চার অক্ষরের ছোট্ট একটা শব্দে তাঁর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করত। হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে আসা শব্দটি ছিল ‘মজিবর’। যাঁরা এখন ২৪ ঘণ্টা বঙ্গবন্ধু আর জাতির পিতা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, তাঁদের ভাবসাব দেখলে মনে হয় তাঁরাই আওয়ামী লীগ তৈরি করেছেন, আর শেখ হাসিনা পরে তাঁদের দলে যোগ দিয়েছেন।
তাহের সম্পর্কে যে উদ্ধৃতি নিয়ে এত হইচই হচ্ছে, তারও একটা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। আমরা এটাকে ‘লুজ টক’ বা কথার কথা বলে এড়িয়ে যেতে চাইলেও শেখ মুজিবের প্রতি তাহেরের প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। শেখ মুজিব যেখানে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগের পর তাঁকে একটি চাকরি দিয়েছিলেন, তিনি সেই চাকরির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গণবাহিনী বানিয়েছিলেন মুজিব সরকারকে উৎখাত করার জন্যই। এ ছাড়া গণবাহিনীর আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভূমিকা সবার জানা, কীভাবে একটার পর একটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়েছিল, কীভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছিল। আমাদের সমস্ত লালিত আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও মূল্যবোধ একের পর এক ধ্বংস করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে কবর দেওয়া হয়েছিল অত্যন্ত নোংরাভাবে। জনগণকে পদদলিত করে জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র।’ এই ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল ১৫ আগস্ট সকালে। তাই তাহের খুনি মেজরদের ‘অনুরোধে’ সকালেই ছুটে গেছেন ঢাকা বেতারকেন্দ্রে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বৈধ রাষ্ট্রপতির রক্তাক্ত মৃতদেহ সাড়ে ৩৩ ঘণ্টা অনাদরে, অবহেলায় পড়ে ছিল। একজন পাকিস্তান-প্রত্যাগত সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য দেখাতে গিয়ে নিজের প্রাণটি বিসর্জন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং পরে বেসামরিক কর্মকর্তা কর্নেল তাহের বীর উত্তম একজন অবৈধ রাষ্ট্রপতিকে সামরিক আইন জারি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কী নিদারুণ বৈপরীত্য!
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট অনেকে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবে এবং আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে একটা সমীকরণ তৈরি হবে। রাজনীতিতে এ ধরনের সমীকরণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে জোর করে আবু তাহেরকে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ বানানোর তো প্রয়োজন নেই। এই কাজটি করে যাঁরা নানা ধরনের ইহজাগতিক সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন, তাঁদের লোভের আগুনে তাহেরের লাশ আবারও পুড়ছে।
অধ্যাপক হোসেন তাহের প্রসঙ্গে আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। আদালতের এই রায়ই শেষ কথা নয়। উচিত হবে একটি ‘কমিশন’ গঠন করা, যাতে করে ১৫ আগস্টের ঘটনার পূর্বাপর এবং এর নেপথ্যের কুশীলবদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়।
আমার লেখার ভগ্নাংশ ছাপা হয়েছে। পুরো বইতে তাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। পাঠক আরও অনেক কিছু জানতে পারবেন, ভাবনাচিন্তার খোরাক পাবেন, যখন বইটি আলোর মুখ দেখবে। তখন সুযোগ তৈরি হবে ফিরে দেখার, অ্যাকাডেমিক আলোচনার। এর আগেই যদি আমরা সত্য লুকাতে চাই এবং নির্মম সত্যকথনের জন্য লেখককে ব্র্যান্ডিং করতে চাই, সেটা কোনো উদারতার পরিচায়ক হবে না। আমাদের উচিত হবে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বাদ দিয়ে সত্যের মুখোমুখি হওয়া। একদা খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমকে যাঁরা ‘ভারতের দালাল’ ও ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে ব্র্যান্ডিং করে জেনারেল জিয়াকে সামনে রেখে বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন, তার পরিণতিতে খালেদ নিহত হয়েছিলেন আরও দুজন বীর উত্তম হুদা, হায়দারসহ। ক্ষমতার লড়াইয়ের এই বিপজ্জনক খেলায় তাহের নিজেও শিকার হয়েছিলেন। আমরা কি এখান থেকেও কোনো শিক্ষা নেব না?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com

No comments:

Post a Comment